©
Search

বর্ষার একদিন by সোহিনী

গত বছর এরম একটা মেঘলা দিনেই আমার গল্পের শুরু।

সেদিন সারাদিনই আকাশ মেঘলা ছিল, দুপুর থেকে আরো অন্ধকার হয় এলো। কিছুতেই কোনো কাজে মন বসছেনা, শুধু বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। বড্ড চঞ্চল লাগছে নিজেকে।

বর্ষাকাল সব সময় আমার প্রিয়। মেঘের গর্জন, টিপ টিপ করে তারপর ঝেঁপে বৃষ্টি নামা, আর সেই ভেজা মাটির গন্ধ। বৃষ্টির পর সবকিছু কেমন পরিষ্কার হয় যায়, যেন সদ্য সদ্য তুলি দিয়ে কেউ রঙ করেছে। না! সত্যি ভালো লাগছেনা বসে থাকতে। জানালার ধারে বসে হওয়া খাচ্ছি অমনি মনে পড়ে গেলো কিছু পুরনো কথা। আমার স্কুলের কথা। আর তার কথা।এরকমই বর্ষাকালে ক্লাসে বসে মেঘের গর্জন শুনতে শুনতে শুধু মনে হতো কখন ছুটি হবে, আর একবার ছুটি হলে বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দ। ওই ঠান্ডা হাওয়া, রাস্তায় জল জমা, সব মানা কে হারিয়ে আমার বৃষ্টিতে ভেজা। সবাই মিলে। সব বন্ধু মিলে। নিজের শহর কে এই সময়েটা আরো বেশি সুন্দর লাগে আর তাই হয় তো হাজার মানার বাঁধ ভেঙে ঠিক এই সময়েই আবার তাকে ফিরে পেলাম.... আবার হারানোর জন্য। সত্যি কি হারালাম? জানিনা।

ভীষণ ইচ্ছে করলো ধুলো জমা বাকসো টা খুলে আবার চিঠি গুলো পড়ি। অজস্র চিঠি যদিও না... তবে ওই একটা চিঠি যা অজস্র চিঠির সমান ছিল।


"কুপমন্ডুক... মানে বুঝিস? কুয়োর ব্যাঙ। হ্যাঁ আমিও জানতাম না তবে আজ জানলাম। আর বুঝলাম আমি তো কুয়োর ব্যাঙ হতে চাই না। তোকে এই চিঠি টা লিখছি অনেক কিছু আশা করে। আমার দ্বারা যে চিঠি লেখা হবে আমি তা ভাবতেও পারিনি। সব তোর কৃতিত্ব। জানিস ভীষণ ইচ্ছে করে তোকে সব বলতে। কিন্তু যদি সবটা শেষ হয় যায়? আর যদি দেখা না পাই তোর? "হারাই হারাই সদা হয় ভয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে" - মনে আছে আমার বাড়িতে বসে দুজনের একসাথে এই গান টা শোনা? এমনিতেও স্কুলের শেষ বছরে দাঁড়িয়ে শুধু মনে হয় স্কুলের পর সব এক থাকবে তো? আমারও তোর মতো ভয়ে হয় পালটে যাওয়ার। আচ্ছা এভাবেই কি সব কিছু না বলে দুজন দুজনকে বুঝে নিতে হবে? দুবছর পরেও? "আমরা" হয় তো এভাবেই লুকোচুরি খেলবো। এটাই আমার প্রথম আর শেষ চিঠি।"


বেশ অন্ধকার করে এসেছে। এবার হয় তো বৃষ্টি নামবে। হ্যাঁ.. এটাই ওর প্রথম আর শেষ চিঠি ছিল। যেখানে সব না বলেও সব বলেছিল।


"ফিরে আসি কুয়োর ব্যাঙে। আচ্ছা কলেজে উঠলে অনেক স্বাধীনতা না? তাহলে খুব ঘুরতে যাবো। পাহাড়ে। যাবি? বেশ ঝুপ করে সন্ধ্যে নেমে আসবে আর আমরা অনর্গল বকে যাবো। ঘরের মধ্যে মেঘ ঢুকে আসবে আর আমি জানি তুই তা দেখে বাচ্চাদের মত লাফাবি। ভোর বেলা দুজনে সূর্য ওঠা দেখবো। অবশ্য কে কাকে ওঠাবে টা জানিনা। দেখিস তোর সত্যি ভালো লাগবে পাহাড়। জানি শুধু পাহাড়ে তুই মানবি না আর তোর রাগ ও হচ্ছে। চিন্তা করিস না সমুদ্রেও যাবো। সন্ধ্যে বেলা চুপচাপ দুজনে সমুদ্রের পারে হেঁটে যাবো। কি খাওয়া যায় বলতো?

শুধু এক জায়গা এ পরে থাকতে চাইনা। আমি হয় তো সত্যি পারবোনা অন্য পাঁচ টা লোকের মত হতে। আমাকে বেড়িয়ে যেতেই হবে। তবে কথা দিচ্ছি তোকে হারাবো না।"


তখন কেই বা জানতো কলেজে উঠে স্বাধীনতা পাওয়া সহজ নয় কারণ যত বড়োই হই মা বাবাদের কাছে "তুই তো এখনও বাচ্চা আছিস রে"। আর কেই বা জানতো সব কথা রাখা যায় না।


" তোর আমার এই সব কথা পাগলামি লাগছে না? বড্ড পাকা পাকা আর নিশ্চয় আরো কৌতূহল বাড়াচ্ছে? সবটা তোর ওপর তোর যা বোঝার তুই বোঝ। জানিস ই তো তোর মত মন প্রাণ খুলে কথা বলতে পারিনা। তোর সামনেও বলতে হোঁচট খাবো। এতদিন ধরে তাই খেয়ে এসেছি। চিঠিটা বড়ো হবেনা এইটা একটা আফসোস। তবে জানি তুই আমার কম কথাতেই অনেক টা বুঝে নিবি। "


পড়া থামাতে হলো। জোরে বৃষ্টি নেমেছে। বাবার ডাকে টনক নড়লো যে জানালা বন্ধ করতে হবে। ইশ বড্ড ভিজতে ইচ্ছে করছে। স্কুলের দিনগুলো কি কিছু করেই ফিরে পাওয়া যাবেনা?


"ঝগড়া। আমার করতেও ভালো লাগে শুনতে তো আরো মজা। বড্ড অসহ্য না আমি? তবে তোর সাথে ঝগড়া, ঝগড়া ছিল না। একটা ভারি মজার খেলা ছিল। তোর একটু তেই রেগে যাওয়া, তোর ছেলে মানুষী, একটু তেই গাল ফুলিয়ে কেঁদে ফেলা, আমি হয় তো কোনোদিন ক্লান্ত হবো না। জানিনা। তবে বড্ড প্রিয় আমার এই "আমাদের" মান অভিমানের খেলা। চিঠির শেষে চলে এসেছি। অনেক কথা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। শব্দ থাকেনা। আর হয় তো তাই সেগুলো আরো সুন্দর হয় ওঠে। তোকে খুব জ্বালিয়েছি। আমিও তোকে বোঝার চেষ্টা করেছি। ঠিক চেষ্টা না, জানিনা। হয় গেছে। নিজে থেকেই। জানিনা আমায় লেখা তোর চিঠির উত্তর কিনা এগুলো তবে বলতে পারিস আমারও মনে অনেক কথা জমে ছিল। যা আজ বকে গেলাম।

আচ্ছা সত্যি করে বল তো সব কি একই থাকবে? আমি, তুই পালটাবো না তো? কিন্তু ওই যে বলে পালটানই নিয়ম।

তোর মত করে শেষ করছি।

ইতি

...."


পড়ার পর চিঠি আবার বাক্সে পুর তার নিজের জায়গা এ রেখে দিলাম। হয় তো জীবনের এত ঝড়ের মধ্যে কিছু ধরে থাকা আবশ্যক হয় উঠেছিল। সেই জন্যই বোধ হয় ওর লেখা চিঠিটা খুব কাছের কেউ হয় ওরকম বৃষ্টির দিনে ধরা দিল।


তারপর কত দিন গেছে। কলেজের সব নতুনত্ব আমাকে আকর্ষণ করেছে। চিঠি চালা চালি তো দূরের কথা আসতে আসতে আমাদের রোজকার কথা ও বন্ধ হয় গেলো। কিন্তু সেদিন...

আবার বহুদিন পর স্কুলের গ্রুপে কথা শুরু হলো, আর তা এগোতে এগোতে ঠিক হলো, না! পুরনো বন্ধুত্ব আবার ফিরে পাওয়া দরকার। "চল সব একদিন দেখা করি।"

সেদিনও ছিল এরম বর্ষাকাল। ভাবিনি তার দেখা পাব। ভাবিনি সে সত্যি আসবে। কিন্তু এতদিন পর, কেনো? কেনো আবার নতুন করে আশা জাগছে? কেনো মনে হচ্ছে পুরনো সব কথা আবার রাখবো? এবার হারাতে দেওয়া যাবেনা। কিন্তু... কিন্তু এবারে যে অনেক বারণ আছে আমাদের মধ্যে। আমরা যে সত্যি পালটে গেছি। দুজনে যা ভয় পেয়ে ছিলাম তাই হলো।

তবে একটাদিন ওকে ফিরে পাওয়া আবার নতুন করে ওকে হারানোর জন্য ছিল না। সব পালটে গেলেও আমরা আজও কিছু না বলেই সব বুঝে নিতাম। তবে কি সত্যি ওকে হারালাম? নাকি নতুন করে পাওয়ার আশা পেলাম? জানিনা।

কিন্তু এক বছর পর কেনো এত কথা মনে পড়লো? হয় তো আজও বৃষ্টির দিন বলে, হয় তো রবীন্দ্রনাথের "একরাত্রি" সব কিছুর মূল। গল্পের মতো আমাদের জীবনেও যদি একটা ঢেউ আসে যা আবার দুজনকে কাছে আনবে? এরকমই বৃষ্টির দিনে? কিন্তু না সেদিন সে ঢেউ আসলো না। সে না হোক... "ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে তোমায় যবে পাই দেখিতে" - আমি তাতেই খুশি।

তবে ঢেউ এর আশায় আমি আছি।




 
 
 
©
©
©